‘জানে তু… ইয়া জানে না’-র সেই নরম, সংবেদনশীল তরুণ। পর্দায় যার নাম জয় রাঠোর, আর নতুন প্রজন্মের আদরের নাম ‘পুকি’। এত দিন পর্দার রোম্যান্টিক নায়ককে ঘিরে যে উচ্ছ্বাস, এ বার তা ছাপিয়ে গেল বাস্তবের ইমরান খানকে ঘিরে। মুম্বইয়ে প্রতিবাদী জমায়েতে হাজির হয়ে পুলিশের হাতে আটক হলেন অভিনেতা। পাশে ছিলেন প্রেমিকা লেখা ওয়াশিংটন এবং তুতো বোন জ়েন মেরি খান। আর এই ঘটনাতেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এলেন বলিউডের এক সময়ের জনপ্রিয় নায়ক। সঙ্গে জুটল ভারত ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশও।
ক্যামেরার সামনে এক প্রতিবাদীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইমরান বললেন, “প্রকৃত শিল্পের মধ্যে শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি মিশে থাকবেই। মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, যা আমাদের নিজস্ব। নিজের মতের পাশে যদি দাঁড়াতে না পারেন, নিজের হৃদয়টুকু যদি শিল্পের মধ্যে ঢেলে না দেন, তা হলে সেই শিল্পের কোনও মূল্য নেই।”
কথাগুলি যেন পর্দার ইমরানকে নতুন করে চিনিয়ে দিল। কিছুদিন আগেও যাঁকে ঘিরে সমাজমাধ্যমে মেতে উঠেছিল নতুন প্রজন্ম, এ বার তাঁর প্রতি অনুরাগের সঙ্গে জুড়ল অন্য এক পরিচয়—নিজের মতামত প্রকাশ করতে পিছপা হন না যে মানুষ।
পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর পুলিশভ্যানের ভিতর থেকে একটি সেলফি পোস্ট করেছিলেন ইমরান। সঙ্গে মজার ছলে লিখেছিলেন, “দেখে তো মনে হচ্ছে, একটু গাড়ি চড়তে বেরিয়েছি।” পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর এই রসবোধ অনুরাগীদের নজর কেড়েছে।
কিন্তু ইমরানকে ঘিরে নতুন করে এত মাতামাতি কেন? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তাঁর অভিনীত এক পুরনো চরিত্রে। ২০০৮ সালের ‘জানে তু… ইয়া জানে না’-র জয় রাঠোর আজকের তরুণ দর্শকদের কাছে আদর্শ ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’। এমন এক পুরুষ, যে নিজের অনুভূতি বোঝে, অন্যের আবেগকে গুরুত্ব দেয় এবং সম্পর্কের মধ্যে নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে জানে। পেশিবহুল শরীর, আগ্রাসী পৌরুষ কিংবা দাপট দেখানোর চেনা ছকের বাইরে জয় যেন অন্য রকম এক নায়ক।
ছবিতে জয় ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে। অথচ তার প্রাণখোলা বন্ধু অদিতি, যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জেনেলিয়া ডি’সুজা, সামান্যতেই ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়তে পারে। দু’জনের এই বৈপরীত্যই ছবির অন্যতম আকর্ষণ। জয়ের কোমলতা, সংবেদনশীলতা এবং সংঘাতের বদলে বোঝাপড়াকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা আজকের দর্শকদের কাছেও প্রাসঙ্গিক। যে কারণে সে হয়ে উঠেছে ‘সফট বয়’ নায়কের প্রতীক, আর ইমরান পেয়েছেন আদরের নাম—‘পুকি’।
অবশ্য এই প্রত্যাবর্তনের পথটা মসৃণ ছিল না। ভক্তদের তৈরি মিম, পুরনো ছবির দৃশ্য এবং সমাজমাধ্যমে স্মৃতিচারণার হাত ধরেই দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা অভিনেতাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছে জেন জ়ি। ‘কাট্টি বাট্টি’ (২০১৫)-র বক্স অফিস ব্যর্থতা এবং ২০১৯ সালে অবন্তিকা মালিকের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ক্রমশ প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন তিনি। তাই নতুন করে তাঁকে ঘিরে এই উন্মাদনা নিছক পুরনো দিনের নস্ট্যালজিয়া নয়, বরং এক পুরনো নায়ককে নতুন চোখে দেখার গল্পও।
খানদানি বলিউড, নিজস্ব পথ
বলিউডের পরিচিত চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান ইমরান। অভিনেতা আমির খান তাঁর মামা, পরিচালক-প্রযোজক মনসুর খানও তাঁর মামা। আর চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসির হুসেন তাঁর দাদু।
১৯৮৩ সালে আমেরিকার উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের ম্যাডিসনে জন্ম ইমরানের। বাবা অনিল পাল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, মা নুজ়হত খান মনোবিদ। ছোট থাকতেই বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তার পর মায়ের সঙ্গে মুম্বইয়ে চলে আসেন তিনি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে চলচ্চিত্র নির্মাণের পাঠ নেওয়ার পর মুম্বইয়ে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন ইমরান। ২০০৮ সালে আব্বাস টায়ারওয়ালার ‘জানে তু… ইয়া জানে না’ দিয়ে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। প্রথম ছবিই তাঁকে এনে দেয় পরিচিতি। এর পর ‘কিডন্যাপ’ (২০০৮) এবং ‘লাক’ (২০০৯)-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
তবে রোম্যান্টিক কমেডিতেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে তাঁকে। ‘আই হেট লাভ স্টোরিজ়’ (২০১০), ‘মেরে ব্রাদার কি দুলহন’ (২০১১) এবং ‘এক ম্যায় অউর এক তু’ (২০১২)—একাধিক ছবিতে তাঁর সহজ, সাবলীল অভিনয় দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। অন্য দিকে, ‘দিল্লি বেলি’ (২০১১)-তে দেখা যায় একেবারে অন্য ইমরানকে। তীক্ষ্ণ রসবোধ, বেপরোয়া মেজাজ এবং চেনা বলিউডি ছক ভেঙে দেওয়া সেই অ্যাকশন-কমেডি থ্রিলার আজও ছবিপ্রেমীদের আলোচনায় ফিরে আসে।
২০১৩ সালে ‘মটরু কি বিজলি কা মন্ডোলা’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বই দোবারা!’ এবং ‘গোরি তেরে পেয়ার মে’-তে অভিনয় করেন তিনি। কিন্তু ছবিগুলি প্রত্যাশিত বক্স অফিস সাফল্য পায়নি। পরে ‘কাট্টি বাট্টি’-র ব্যর্থতার পর তাঁর অভিনয়জীবনেও দীর্ঘ বিরতি আসে।
পর্দার জয়, বাস্তবের ইমরান
এক দশকেরও বেশি সময় পর ইমরানের জীবনে নতুন মোড় এল এমন এক মুহূর্তে, যা কোনও ছবির প্রচার কিংবা তারকা-ভাবমূর্তি তৈরির পরিকল্পনার অংশ নয়। প্রতিবাদী জমায়েতে তাঁর উপস্থিতি এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে বক্তব্য নতুন করে সামনে এনেছে পর্দার বাইরের মানুষটিকে।
জেন জ়ি-র কাছে ইমরান এত দিন ছিলেন সেই নায়ক, যিনি প্রেমের সম্পর্কে সংবেদনশীল, বন্ধুত্বে নির্ভরযোগ্য এবং আবেগ প্রকাশে অকপট। এ বার তাঁর বাস্তব জীবনের একটি ঘটনাও সেই পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গেল। তবে পর্দার চরিত্র আর বাস্তবের মানুষ এক নন—এই পার্থক্য মাথায় রেখেও বলা যায়, নিজের মত প্রকাশের প্রশ্নে ইমরানের বক্তব্য তাঁর অনুরাগীদের কাছে নতুন অর্থ পেয়েছে।
এখন অপেক্ষা, অভিনয়ে কবে ফিরবেন তিনি। ‘জানে তু… ইয়া জানে না’-র জয়কে আবার বড় পর্দায় দেখতে চান বহু অনুরাগী। তবে তার আগে বাস্তবের ইমরান খান যে নতুন করে দর্শকের কৌতূহলের কেন্দ্রে, তা স্পষ্ট। আদরের ‘পুকি’ এ বার শুধু পুরনো প্রেমের ছবির স্মৃতি নন—তিনি হয়ে উঠেছেন নিজের শর্তে বাঁচতে চাওয়া এক অভিনেতার নামও।